একটি নাটকের সাথে কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসার তুলনা? এই নিন আসল সত্য

কিছুদিন ধরে অনেক মাদ্রিদিস্তাদের শুনতে হচ্ছে মেসির মত জিদানও তো অবসর থেকে ফিরে এসেছিল তাহলে মেসিকে কেন তুচ্ছ করা হচ্ছে আর জিদানকে কেন এত বেশি সম্মান করা হচ্ছে। জিদান যা করেছিল মেসিও সেটাই করেছে। এসব কথায় শুনতে হচ্ছে অনেক মাদ্রিদিস্তাকে। তাই আজকে জিজুর আর লিও মেসি সম্পর্কে কিছু লিখলাম একটু সময় নিয়ে পড়লে সব বুঝতে পারবে আশা করি। ছবির মানুষটাকে দেখলেই সবাই এক নজরে বলে দেবে জিজু। তার কীর্তি ফুটবল ফ্যানেরা মনে রাখবে আজীবন। আর তার কীর্তিকে ভুলে যাওয়ার মত দুঃসাহস কেউ দেখাবে বলে মনেও হয় না। আর ফুটবল কীর্তি ভুলতে বসলেও অনেকে হয়তো মনে রাখবেন ২০০৬ এ ইতালির বিপক্ষে মাতারাজ্জিকে বুকে হেড দিয়ে ফেলে দেওয়ার দৃশ্যটা মনে রাখবে সবাই। ১৯৭২ সালে জন্ম নেওয়া ফুটবল কিংবদন্তী জিনেদিন জিদান হয়তো এখন পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলয়াড়দের একজন। পেলে ম্যারাডোনাকে দর্শকরা যে কাতারে দেখে। তাদের যে পরিমাণ ভালবাসে এবং শ্রদ্ধা করে জিদানকেও তার থেকে কোন অংশে কম দেখে না ফুটবল ফ্যানরা। আলজেরিয়ান এবং ফ্রান্স দুই দেশেরই নাগরিকত্ব ছিল জিদানের। জিদান প্রথমে আলজেরিয়ারর জাতীয় দলে খেলতে চেয়েছিল কিন্তু শোনা যায় তখনকার আলজেরিয়ান কোচ নাকি জিদানের ভেতর এক্সট্রা অরডিনারি কিছু খুঁজে পাননি তাই তাকে সিলেক্ট করেননি। পরে ১৯৯৪ সালে জিদান প্রথম ফ্রান্স জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েছিল। ১৯৯৬ সালে জিদান প্রথম ইউরোতে সুযোগ পায়। সে সময় জিদান ফ্রান্স টিমে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেনি নিজের সর্বচ্চটুকু দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপে কোন রকমে ধুকতে থাকা ফ্রান্স কীভাবে কীভাবে যেন জিজুর ম্যাজিকে বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠে যায়। বেশির ভাগ মিডিয়া সহ ফুটবল ব্যক্তিত্বরা তখন ব্রাজিলকে খেলার আগেই বিজয়ী ঘোষনা করে দিয়েছিল। কারণ উড়তে থাকা ব্রাজিলের সামনে সেই ফ্রান্স টিমটা যেন কিছুই ছিল না। ব্রাজিল তখন ফর্মের তুঙ্গে। একটানা দ্বিতীয় বারের মত বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচু করে ধরার স্বপ্নে বিভোর ব্রাজিল টিম। কিন্তু তারা হয়তো তখনো বুঝতে পারেনি প্রতিপক্ষ টিমে রয়েছেন জিদান নামের একজন ম্যাজিশিয়ান। যার জাদুতেই ফ্রান্সের সামনে দাঁড়াতে পারেনি ব্রাজিলের মত দল। প্রথম অর্ধ শেষ হওয়ার পূর্বেই ব্রাজিলের জালে দুইবার বল জড়িয়েছে ফ্রান্স সরি জিদান। তাই প্রথম অর্ধের পরেই বোঝা হয়ে গেছিলো যে ট্রফিটা কাদের ঘরে যাচ্ছে। ঠিকই সেবার বিশ্বকাপ ট্রফিটা জিদানের হাতেই উঠেছিল আর বিশ্ব দেখেছিল একক হাতে কীভাবে একটি দলকে বিশ্বকাপ ট্রফি এনে দেওয়া সম্ভব। ২০০০ সালে জিজু দ্বিতীয় বারের মত ইউরো খেলতে নামে। এবার আর সে কাউকে হতাশ করেনি। এবার ঠিকই ইউরো জিতে ফিরেছিল ফ্রান্সে জিজু। আর সেবারই প্রথম কোন ইউরোপীয় দল বিশ্বকাপ এবং ইউরো পর পর জিতেছিল। আর সেটাও সম্ভব হয়েছিল জিজু ম্যাজিকে। ২০০২ এ হয়তো ভাগ্য জিজু এবং ফ্রান্স কারো সাথেই ছিল না। ইঞ্জুরির কারণে পুরো বিশ্বকাপই খেলার কথা ছিল না জিদানের কিন্তু জোর করেই অনেকটা ছিলেন স্কোয়াডে। গ্রুপ স্টেজের প্রথম দুই ম্যাচেই ইঞ্জুরির কারণে খেলতে পারেননি জিদান আর সেই দুই ম্যাচেই গোল করতে ব্যর্থ হয়েছিল ফ্রান্স। তৃতীয় ম্যাচে ইঞ্জুরি নিয়েও মাঠে নেমেছিলেন কিন্তু ইঞ্জুরি গ্রস্থ জিদান ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে তাই গ্রুপ স্টেজ থেকেই খালি হাতে বিদায় নিতে হয়েছিল ১৯৯৮ এর চ্যাম্পিয়নদের। ২০০৪ এর ইউরোতে নিজেদের গ্রুপের ইংল্যান্ড সুইজারল্যান্ড কে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নক আউট স্টেজে উঠেছিল ফ্রান্স কিন্তু নক আউট স্টেজেই ঘটলো অঘটন। গ্রীসের কাছে ১-০ গোলে পরাজয় বরণ করে নক আউট স্টেজ থেকেই বিদায় ফ্রান্সের। আর এর পরেই অবসর নিয়ে বসেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলয়াড় জিনেদিন জিদান। ২০০৬ এর বিশ্বকাপের মূল পর্বেই কোয়ালিফাই করতে পারছিল না তখনকার ফ্রান্স। দল থেকে দলের সব বড় বড় তারকারা অবসরে যাওয়াতে দল একদম হঠাৎ করেই ভেঙে পড়েছিল তাসের ঘরের মত। তাই আবারও দলের প্রয়োজনে ফিরে এসেছিল জিদান। ( শোনা যায় কোচ এবং স্বয়ং ফ্রান্স প্রেসিডেন্টের ফোন কলেই অবসর ভেঙে খেলায় ফেরে জিদান) ফেরার পরের কাহিনীটা তো সবার জানা। যে ফ্রান্স কোয়ালিফাই রাউন্ড থেকেই বাদ পড়ছিল সেই ফ্রান্সই একের পর এক জায়েন্ট দলকে বধ করে ফাইনালে উঠেছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে তারা হারিয়েছিল হয়তো সব থেকে ফেভারিট দল ব্রাজিলকে। ব্রাজিল দলের সব তারকারা যেন মাঠে দাঁড়িয়ে শুধু জিদানের ম্যাজিক দেখছিল আর নিজেদের অসহায়ের মত মনে করছিল। জিদান একাই যেন ব্রাজিলকে হারিয়ে সেমিতে নিয়ে গেল ফ্রান্সকে। সেখান থেকে ফাইনালে। আর ফাইনালেও হয়তো জিতেও যেত যদি অঘটনটা না ঘটাতেন জিদান। প্রথম অর্ধে ১-০ তে এগিয়েও গিয়েছিল জিদানের পেনাল্টি থেকে গোলের মাধ্যমে আবার ইঞ্জুরি টাইমে দ্বিতীয় গোলও প্রায় করে ফেলেছিলেন জিদান কিন্তু বুফন কীভাবে কীভাবে যেন সেটা সেভ করে ফেলেছিল অনেক পরে বুফন সেই হেড নিয়ে অনেক কিছু বলেছিলেন বিরতিতে যাওয়া আগে বেশ ভাল অবস্থানে ছিল ফ্রান্স আক্রমণে ছিল ফ্রান্স আর চলছিল জিজু ম্যাজিক। এরপর ম্যাচে সমতায় ফিরেছিল ইতালি এবং ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের ১১০ মিনিটে জিদান করে বসেন ক্ষমার অযোগ্য একটি কাজ। মাতারাজ্জিকে মাথা দিয়ে বুকে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলেন জিদান আর সাথে সাথেই লাল কার্ড। (শোনা যায় ইতালির কোচ নাকি তাদের প্লেয়ারদের বলেছিলেন যেভাবেই হোক জিদানকে থামাও না হলে কাপ জিততে পারবে না। আমার একটা খেলয়াড় লাল কার্ড খেলেও কোন সমস্যা নেই তারপরেও জিদানকে থামাও। এরপর তারা জিজ্ঞাসা করেছিল কীভাবে থামাবো জিদানকে তখন কোচ নাকি উত্তর দিয়েছিলে এত বছর প্রোফেশনাল ফুটবল খেলার পর অন্ততপক্ষে এই কথাটা বলে দেওয়ার দরকার পড়ে না।) এরপর কি হয়েছিল সেটা ফুটবল দর্শকরা জানে। মাতারাজ্জিকে হেড তার পেছনের কারণ ছিল (পরে জিদান যেটা বলেছিল) তার মাকে তুলে গালি দিয়েছিল মাতারাজ্জি। আর তখনই জিদান আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনি। আর সেই ম্যাচে পেনাল্টি শ্যুট আউটেও অংশগ্রহণও করতে পারেনু জিদান। ফ্রান্সও হেরেছিল ৫-৩ শ্যুট আউটে। জিদান থাকলে হয়তো কিছু একটা হত। ফ্রান্সের ঘরেই উঠতো শিরোপা আর জিদান চলে যেত সর্বকালের সর্ব সেরার সবার উপরে।(যদিও এখনো সে সেই কাতারেই আছে।) জিদান ২০০৪ এর ইউরোতে হারার পরে অবসরে গিয়েছিল কিন্তু তার আগে দেশের হয়ে সে বিশ্বকাপ+ইউরো জিতেছিল এবং ফিফা প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার এবং ব্যালন ডি অর জিতেছিলেন। তারমানে সর্বজয়ী হওয়ার পরেই জিদান অবসরে গিয়েছিলেন এবং দেশের ফুটবলের করুণ পরিস্থিতির কারণে অবসর ভেঙে দেশের জন্য খেলতে চলে এসেছিলেন। অপর দিকে লিওনেল মেসি হয়তো ক্লাবের হয়ে সব কিছুই জিতেছেন। একেরপর এক রেকর্ড গড়েছেন সব থেকে বেশি বার বিশ্বসেরা খেলয়াড় হয়েছেন কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে একটানা তিনটা ফাইনালে কিছুই করতে পারেননি। এখন হয়তো সবাই বলবেন সতীর্থদের সাহায্য ছাড়া কীভাবে জিতবে? বা হিগুয়েনের মত খেলয়াড় থাকলে কীভাবে জিতবে? তাহলে তাদের বলি আপনারা জিজুর সাথে তুলনা করতেছেন কীভাবে?? জিজু একাই ১৯৯৮ এ ব্রাজিলকে হারিয়েছিল। ফাইনালে ২ গোল করেছিল আবার ইউরো ২০০০ জিতিয়েছল তখনকার ফ্রান্স টিমটাও একটু ভাল করে দেখবেন। আর লিও মেসি?? তার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা রেখেই বলছি লিও মেসি তিনটা ফাইনালে শুধু হতাশা ছাড়া কিছুই দিতে পারেননি। তিনটা ফাইনালেই সে দেশকে ডুবিয়েছে। নিজের ছায়া হয়েই খেলেছে তিন ফাইনালে। এবং তিনি পুরোটাই ব্যর্থ। আর অবসরে যাওয়াটাও তার একটা চালাকি ছিল। যাতে তাকে কোন প্রকার দোষারোপ করা না হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সেই সম্পূর্ণরূপে দোষী তিনটি ফাইনালে হারার জন্য। তাই যারা লিও মেসিকে জিজুর সাথে তুলনা করছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলি জিজু অবসরে যাওয়ার আগে নিজের একক প্রচেষ্টায় ক্লাব এবং জাতীয় দলকে বিশ্বসেরা করেই অবসর নিয়েছেন লিও মেসির মত নয় ব্যর্থ হয়ে তারপর অবসরের নাটক করেছেন। আবার ফিরে এসেও দেশকে ধুকতে থাকা অবস্থা থেকেও বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন এবং নিজে হয়েছিলেন বিশ্বকাপের সেরা খেকয়াড় সেটাও ঘোষণা করা হয়েছিল ফাইনাল ম্যাচের আগেই। এটাই হল জিনেদিন জিদান। সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবল খেলয়াড়। সর্বাকালের সেরাদের নাম নিতে হলে জিদানের নামটাও চলে আসে সব সময়। তাই তুলনা করার আগে একটু দেখে শুনে জেনে তুলনা করবেন।

Comments