ম্যাজিক অর্থাৎ জাদু বলতে সত্যিকারের কিছুই নাই। তবে আমরা আমাদের বাস্তব জীবনে অতিমানবীয় কিছু বিষয়কে জাদুর সাথে তুলনা করি। মনে করি এসব বিষয় যে আমাদের সামনে প্রকাশ করছে সে-ই জাদুকর। এরকম অনেক জাদুকর আমাদেরকে যাদুর মোহে টেনে নিচ্ছে। তাদের অবিশ্বাস্য কিছু ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে আমাদের মনকে ভুলিয়ে দিচ্ছে। ফুটবল মাঠে কেউ যদি কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত এবং আশ্চর্যজনক স্কিল দেখাতে পারে তাহলে আমাদের কাছে সে জাদুকর।তারা ইতিহাসে থেকে যায় তাদের জাদুকরী প্রদর্শনীর জন্য। বর্তমানেও কিছু জাদুকর আমাদের চোখের সামনে দিয়ে তাদের জাদু দেখাচ্ছে। এদের মধ্যে একজন ক্রোট তার জাদুবিদ্যায় মুগ্ধ করছে দর্শকমন। হ্যা, তার নাম লুকা মদ্রিচ। সমর্থকেরা তার নাম দিয়েছে লুকা “ম্যাজিকাল” মদ্রিচ।
লুকা মদ্রিচ ১৯৮৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ক্রোয়েশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা একজন এরোমেকানিক ছিলেন। লুকার বয়স যখন ৬ তখন শুরু হয় ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ। যুদ্ধচলাকালীন সময়ে তারা ‘জাদার’ অঞ্চলে স্থানান্তর হন। যুদ্ধের ভয়াবহতা যেন লুকা’র মনে আঘাত করতে না পারে সে জন্য তার অভিভাবকেরা তাকে স্থানীয় ফুটবল ক্লাবে পাঠান। সেখান থেকেই শুরু হয় পথচলা।
১৬ বছর বয়সে তাকে বিখ্যাত ডায়নামো জাগ্রেব কিনে নেয়। সেখানে মাত্র এক মৌসুম থাকার পর বসনিয়া-হারজেগোভ
িনা প্রিমিয়ার লীগে ঐ দেশের প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার নির্বাচিত হন। পরে তিনি নিজ দেশের ইন্টার যাপ্রেসিচ ক্লাবে যোগ দেন এবং ক্লাবটিকে লিগের ২য় স্থানে উন্নীত করতে সাহায্য করেন। ২০০৪ সালে তিনি ক্রোয়েশিয়া ফুটবল হোপ অফ দ্যা ইয়ার পুরষ্কার পান। ২০০৫ সালে তিনি আবার ডায়নামোতে ফিরে আসেন। তখন থেকে তার উন্নতি আরো তোরজোড়ে হতে থাকে। বাড়তে থাকে সমর্থকদের ভালোবাসা। তার কন্ট্রিবিউশনের কারণেই যে ডায়নামো টানা ৩ বার লিগ জিতে। কোয়ালিফাই হয় ইউয়েফা কাপ এ। তার এই কৃতিত্বের কারণে তাকে তার শেষ হোম ম্যাচে স্ট্যান্ডিং অভেশন দেয়া হয়।
২০০৮ সালে তিনি পাড়ি জমান ইংলিশ ক্লাব টটেনহাম হটস্পারে। নতুন পরিবেশ, নতুন দল, নতুন প্রতিপক্ষ অবশ্য তাকে দমাতে পারেনি। মিডফিল্ডার হয়ে তিনি পুরো মাঠ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। পেয়েছেন অবিস্মরণীয় খ্যাতি। ২০০৮-০৯ সিজনে তিনিই প্রথম ট্রান্সফার ছিলেন এবং স্পারসদের তখনকার সর্বাধিক বেতন প্রাপ্ত খেলোয়াড়। তার বল কন্ট্রোল, কলাকৌশল, পাসিং, রিসিভিং সবই যে ছিল বিমোহিতকর। হ্যারি রেডন্যাপ তার গুরুত্ব বুঝে তাকে সর্বাধিক পরিচিত আটাকিং সেন্ট্রাল মিডফিল্ড এবং লেফট উইং এর দায়িত্ব দেন। ফলাফল হল দেখার মত। একইসাথে এসিস্ট এবং একের পর এক গোল করতে থাকেন লুকা। ২০০৯-১০ সালের শুরুতে স্পারসদের সাবেক অধিনায়ক জেমি রেডন্যাপ বলেন,
"He’s a hell of a player and a manager’s dream, so I am told. He trains like a demon and never complains, will work with and without the ball on the field and can beat a defender with a trick or with a pass. He could get into any team in the top four and he’ll be even better this season."
গুণিজনের কথা তো আর মিথ্যা হতে পারে না। এই সিজনে যেন কথাটি প্রমাণ করতেই মদ্রিচ উঠে পড়ে লাগেন। তবে পা ভেঙে যাওয়ায় বেশ কিছুদিন তাকে থাকতে হয় মাঠের বাইরে। অবশ্য মাঠে ফিরে আসলেন এমন ভাবে যেন তিনি কখনো বাইরেই যাননি। ১১মিনিটের মধ্যেই যে পা ভেঙেছিল ঐ পা দিয়েই গোল করেন। এর চেয়ে ভালো প্রত্যাবর্তন আর কি হতে পারে? সিজনের শেষে তাকে ২০১৬ পর্যন্ত চুক্তি দেয়া হয়। এসময় তিনি বলেন,
Tottenham Hotspur gave me my chance in the Premier League and I want to go on to achieve great success here with them. Yes, there have been enquiries from other big clubs, but I have no interest in going anywhere. Last season’s top- four finish was an indication of where we are as a Club and I feel I can continue to improve and go on to achieve everything I want to at Spurs
এরপরের দুইটি সিজন অর্থাৎ ২০১০-১১, ২০১১-১২ একই রকম সাফল্য দিয়ে কেটে যায়। নিখুত পাস, কৌশল প্রদর্শন এবং সুসময়ে গোল করে দলকে এনে দিয়েছেন কাঙ্খিত জয়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর সাথে একটি ম্যাচের পর কোচ হ্যারি রেডন্যাপ তার প্রশংসায় আপ্লুত হয়ে বলেন,
"He was unbelievable. Magnificent. He’s an amazing footballer, the little man takes the ball in the tightest areas with people around him, wriggling out of situations. He could play in any team in the world"
২০১২ সালে তার অর্জিত সাফল্য যেন তাকে সর্বোৎকৃষ্ট উপহার দেয়। পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ক্লাবগুলোর একটি দ্যা রয়্যাল রিয়াল মাদ্রিদ তাকে ৩৩ মিলিয়ন ইউরোতে কিনে নেয়। দুইদিন পরে সুপারকোপা ডে এস্পানা ফাইনালে বার্সেলোনার বিপক্ষে তার অভিষেক হয়। মাদ্রিদ ঐ ম্যাচ জিতায় মাত্র ৭ মিনিট খেলে তিনি সাইনিং এর ৩৬ ঘন্টার মধ্যে প্রথম রয়্যাল শিরোপার অংশিদার হন। তবে জাবি আলোনসো, সামি খেদিরা ও মেসুত ওজিলের মধ্যমাঠে তার স্থান কিছুটা সংকীর্ণ হয়ে যায়। তাই হোসে মৌরিনহোর প্রথম দলে এবং সাবস্টিটিউট চয়েস থেকেও অনেকটা বঞ্চিত থেকে যান মদ্রিচ। তাও তিনি চালিয়ে যান তার পরিচিত এসিস্ট এবং গোল। মাদ্রিদে এসে গোলগুলো আরো বিস্ময়কর হয়ে যায়। তার বেশিরভাগ গোল আসতে থাকে ডি বক্সের বাইরে থেকে। সিএল ১২/১৩ তে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর বিপক্ষে তার এরকম একটি গোল রিয়ালকে নিয়ে যায় সেমিফাইনালে। তাছাড়া ক্রিষ্টিয়ানো রোনালদো, করিম বেনজেমাদের ডিফেন্স চেড়া থ্রু পাস দিয়ে গোটা সিজনে এসিস্ট করেছেন অনেকগুলো। তার ভাগ্যের দুয়ার খুলে ১৩/১৪ সিজনে। মেসুত ওজিল ও কাকার ক্লাব ত্যাগ এবং সামি খেদিরার লম্বা সময়ের ইনজুরি মাদ্রিদ দলে তার অবস্থান পাকা করে দেয়। আর তিনি সুযোগ কাজে লাগাতে থাকেন ঠিক তার পুরোন দিনগুলোর মতই। ফিরে আসেন পুরোন উদ্যমে। প্রকাশ করতে থাকেন তার চাঞ্চল্য। তার কৃতিত্বের অংশিদার হয় মাদ্রিদবাসী এবং সমর্থকেরা। আনচেলত্তির অধীনে তিনি হয়ে যান অদম্য। তাকে আর আটকনো যায় না। কৌশল দেখে মুগ্ধ হয়ে কত মানুষ তার কত প্রশংসা করলো। তার কন্ট্রিবিউশন এ রিয়াল মাদ্রিদ জিতলো কোপা দেল রে এবং সাধের লা দেসিমা।
এসকলের জন্য ছোট-খাট মানুষটি এখনই হয়েছেন স্মরণীয়, আর এজন্যই ভালোবেসে ফুটবল অনুরাগীরা তার নাম দিয়েছে লুকা ম্যাজিকাল মদ্রিচ।
Comments
Post a Comment