“জিদান তামীমি-২০১৬”

কচি-কাচাদের নিয়ে ভালই দিন কাটাচ্ছিলেন । বোর্জা মায়োরাল, মার্টিন ওডেগার্ড কিংবা পুত্র এনজোদের নিয়ে দায়িত্ব পেয়েছিলেন মাদ্রিদের পরবর্তী প্রজন্ম গড়ার । কিন্তু বর্তমান প্রজন্মই যে তখন অন্ধকার কুঁঠুরিতে সেধিয়ে যাচ্ছিলো । বড্ড তাড়াহুড়ো করেই তাই তার জরুরী ডাক পড়লো বার্নাব্যুর বড়দের সাজঘরে । ৪ঠা জানুয়ারী ২০১৬ ! বেনিতেজের স্থলাভিষিক্ত টেকো মাথার এক সাবেক ফ্রান্স ও মাদ্রিদ কিংবদন্তী । খেলোয়ারী জীবনে সম্ভাব্য সব সাফল্যই তার হাতে ধরা দিয়েছিল । দেশ ও ক্লাবের হয়ে চুঁমু একেছিলেন সব ট্রফিতেই । বুটজোড়া উঠিয়ে নেওয়ার আগেই হয়ে গিয়েছিলেন সর্বস্বীকৃত জীবন্ত কিংবদন্তি । বলছিলাম জিদানের কথা । জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান !
ভাল ছাত্র হলেই কি ভাল শিক্ষক হওয়া যায় ? আশংকায় প্রশ্ন তখন খোদ রিয়াল মাদ্রিদ ভক্ত শিবিরেই । মাত্র ১৮ মাস একটা একাডেমির কোচিং করানো লোকটি কি পারবে অথৈ সাগরে এতবড় জাহাজ চালাতে ? সময় গড়িয়েছে । প্রশ্ন আর আশংকাগুলো ফিঁকে হতে হতে তা তলিয়ে গেছে অথৈ সমুদ্রের তলদেশে । আর জিদান ? স্যুট-সাফারিতে বৈঠা বাইছেন আকাশের তাঁরা দেখে । শুধু কি দেখেই ক্ষান্ত তিনি ? ছুঁয়ে ফেলেছেন বললে খুব বেশি অতিরঞ্জন হবেনা বৈকি । লা লীগায় তার দল ১২ পয়েন্টে পিছিয়ে টেবিল রাজা বার্সেলোনা থেকে । হেসে খেলে লীগ জেতা তখন অতি স্বাধারণই ছিল চির প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য । অথচ সেই লীগ শিরোপা মিমাংসা হলো লীগের শেষ ম্যাচগুলিতে, ০১ পয়েন্টের ব্যবধানে । ক্যাম্প ন্যু'তে গিয়ে বার্সার ৩৯ ম্যাচের অজয় রথ থামানো কিংবা রোমে গিয়ে মাদ্রিদের ইতালিয়ান জুজু ঘোঁচানো- জিদানের জাদুকাব্য যেন তখনই জানলো বিশ্ব । ইতালিয়ান জুজু কাটালেও পা কাটা পড়লো জার্মানিতে গিয়ে । সে শোধ অবশ্য জিদান ফিরতি লেগেই তুলে নিয়েছেন রোনালদো নামক তলোয়ার দিয়ে । ভল্ফসবার্গের সাথে পরাজয়ের আগে অবশ্য আরেকটি পরাজয় ঘটে তার । বার্নাব্যুতে তার অভিষিক্ত মাদ্রিদ ডার্বি তাকে দেয় নূন্যতম ব্যবধানে পরাজয়ের তেতো স্বাদ । ঐ দুটো পরাজয়ই ! এরপর এখন পর্যন্ত হারের সাথে সাপে-নেউলে সম্পর্ক রেখেছেন এই ফ্রেঞ্চম্যান । সকল প্রতিযোগীতা মিলিয়ে তার দল ৩৭ ম্যাচ যাবত অপরাজেয় । আর এই অপরাজেয় ঋতুতেই প্রারম্ভিক ইতিহাস গড়েছেন জিজু । তার হাত ধরেই বার্নাব্যুতে এসেছে একাদশতম ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্ব । বেল, বেঞ্জেমা, রোনালদো ত্রয়ী ছাড়াই বগলদাবা করেছেন উয়েফা সুপার কাপ । অদম্য জয়রথের সাথে সাথে থেমে থাকেনি জিজুর রম্য শিরোপা লোভও । তাইতো মিলান, নরওয়ের পর বছরের শেষ বাঁজিটাও জিতেছেন জাপানে ক্লাব বিশ্বকাপ মুকুট বিজয়ে । বছর শেষে ১ ম্যাচ কম খেলেও লীগ টেবিল প্রথম স্থানটা তারই দখলে ।
একজন গুরু জিদানের এই বছরটা ইতিহাস রচয়ী হলেও তা মোটেও সহজ ছিলোনা । মৌসুমের শুরুতে তাকে রোনালদো ছাড়াই খেলতে হয়েছে । বেঞ্জেমাও মাঠে ছিল কদাচিত্‍ । বছরের শেষাংশে এসে মধ্যমাঠের প্রাণত্রয়ী মদ্রিচ-ক্রুস-ক্যাসিমিরোকে ছাড়াও তাকে পরীক্ষা দিতে হয়েছে । পরীক্ষায় ফেলেছিল তাকে নাভাস, রামোস, মার্সেলোর লম্বা আঘাতও । তাতে হয়ত কপাল কুঁচকেছে তার, তবে মুঁচড়ে যাননি । বিকল্পদের দিয়েই মাতিয়েছেন মাঠ, দেখিয়েছেন অনেক বিজয় ঘাট । নিয়মিত ভক্ত আর দর্শকরাই বলতে পারবে জিদান কতটা পরীক্ষা ডিঙ্গিয়ে এসেছে । তবে আপাত পরিসংখ্যান কিন্তু সবকিছু সহজই বানিয়ে দিচ্ছে । এ যাবত রিয়াল মাদ্রিদ তার অধীনে খেলেছে ৫৩টি ম্যাচ । যার ২টিতে হার আর ১১টি ড্র দেখেছে লস ব্ল্যান্কোসরা । ঈর্ষনীয় ৭৫.৪৭ জয় গড়ে জিতেছেন পাক্কা ৪০টি ম্যাচ । এই ৫৩ ম্যাচে তার দল প্রতিপক্ষের জালে ১৫০ বার বল পাঠিয়েছে । আর নিজেদের জালে হজম করেছে ৪৯টি গোল ।
বছর শেষ ঈর্ষনীয় এই পরিসংখ্যানে জিদানের ঠোঁটের কোণে বিশুদ্ধ অহংবোধের হাসি আসাটা বড্ড স্বাভাবিক । স্বাভাবিক তৃপ্তি আনন্দ মুখ-কান ছড়িয়ে তেলতেলে টেকোতে গিয়ে জ্বলজ্বল করাও । জয় আনন্দ ঝলসে জ্বলুক তার বদনে, জ্বলুক বার্নাব্যু জয় রোদনে । তারা দেখে, তারা ছুঁয়ে দুর্বার চলুক জিনেদিন জিদানের জাহাজের জয় যাত্রা ।
Written By: Samiul Haque Shoumik

Comments